|

Doom Scrolling নিয়ন্ত্রণে না আনলে কী হতে পারে ভবিষ্যতে?

‘ডুম’ শব্দের অর্থ হলো ধ্বংস বা চরম বিপর্যয়। যখন কোনো ব্যক্তি ক্রমাগত নেতিবাচক বা হতাশাজনক সংবাদ ইন্টারনেটে পড়তে বা দেখতে থাকে, তখন তাকে ডুম স্ক্রোলিং বলে। এটি সাধারণত একটি আসক্তির মতো কাজ করে।

কেন আমরা এটা করি?

আমাদের মস্তিষ্ক বিবর্তনগতভাবেই বিপদ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। আমরা মনে করি, খারাপ খবরগুলো জানলে হয়তো আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারব। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার ‘অ্যালগরিদম’ আমাদের এই আগ্রহকে অপব্যবহার করে।

আপনি যদি একবার কোনো নেতিবাচক খবরে ক্লিক করেন, ফেসবুক বা ইউটিউব আপনার সামনে আরও শত শত একই ধরনের ভিডিও নিয়ে আসবে। অভিভাবক হিসেবে আপনি যখন এই চক্রে আটকে যান, তখন আপনার অজান্তেই আপনার মেজাজ খিটখিটে হতে শুরু করে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে আপনার সন্তানের ওপর।

আপনার ডুম স্ক্রোলিং কীভাবে সন্তানের মানসিক ক্ষতি করছে?

বাবা-মা হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানের প্রথম এবং প্রধান শিক্ষক। আমরা যা করি, সন্তানরা তাই শেখে। আপনার এই ডিজিটাল অভ্যাসটি সন্তানের জন্য কেন ক্ষতিকর, তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

আবেগীয় অবহেলা (Emotional Neglect):


সন্তানরা যখন তাদের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে আসে বা তাদের মনোযোগ চায়, তখন অনেক সময় দেখা যায় বাবা-মা ফোনের স্ক্রিনে কোনো নেতিবাচক খবর বা ভিডিওতে বুঁদ হয়ে আছেন। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘স্টিল ফেস ইফেক্ট’ (Still Face Effect)।

আপনি যখন ফোনে কোনো খারাপ খবর দেখেন, আপনার চেহারায় তখন দুশ্চিন্তা বা রাগের ছাপ থাকে। সন্তান যখন আপনার সেই পাথরের মতো শক্ত বা বিরক্ত মুখ দেখে, সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সে মনে করে সে আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে সন্তানের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে।

উৎকণ্ঠা ও ভয়ের সঞ্চার:


আপনি যখন ডুম স্ক্রোলিং করেন, তখন আপনার নিজের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ (Anxiety) কাজ করে। শিশুরা অত্যন্ত সংবেদনশীল; তারা তাদের বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা খুব দ্রুত বুঝতে পারে। আপনি যখন অস্থির থাকেন, আপনার সন্তানও সেই অস্থিরতা অনুভব করে। যদিও সে খবরটি বুঝছে না, কিন্তু আপনার উদ্বেগ তার মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। সে ভাবতে শুরু করে যে পৃথিবীটা বোধহয় খুব ভয়ংকর এবং অনিরাপদ একটি জায়গা।

অনুকরণের মাধ্যমে নেতিবাচক আসক্তি:


সন্তানরা তাদের বাবা-মাকে যা করতে দেখে, তাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। আপনি যদি সারাক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে স্ক্রল করেন, তবে আপনার সন্তানও ভাববে ফোনই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে খুব ছোটবেলা থেকেই সে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। আপনার ডুম স্ক্রোলিং-এর অভ্যাস তার মধ্যে স্ক্রিন আসক্তির বীজ বুনে দিচ্ছে।

অভিভাবকের ওপর ডুম স্ক্রোলিং-এর প্রভাব এবং সন্তানের ঝুঁকি

বিজ্ঞানীরা ডুম স্ক্রোলিং-এর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। এর ফলাফল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক:

কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের প্রভাব:

ইয়েল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমাগত নেতিবাচক খবর দেখলে মানুষের শরীরে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়। একজন স্ট্রেসড বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাবা-মা কখনো সন্তানের সাথে ভালো আচরণ করতে পারেন না। আপনি হয়তো তুচ্ছ কারণে সন্তানের ওপর চিৎকার করে উঠছেন, যার মূল কারণ আপনার দীর্ঘক্ষণ স্ক্রল করার ফলে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ।

নেতিবাচক পক্ষপাত (Negative Bias):

ডুম স্ক্রোলিং আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে তৈরি করে যে আমরা সবকিছুর মধ্যেই খারাপটা খুঁজি। আপনার সন্তান যখন কোনো ভালো কাজ করবে, আপনার ডুম স্ক্রোলিং-এ অভ্যস্ত মস্তিষ্ক হয়তো তাতে খুশি হওয়ার বদলে কোনো একটি ছোট খুঁত খুঁজে বের করবে। এটি সন্তানের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।

সহানুভূতির অভাব (Lack of Empathy):

প্রতিনিয়ত ইন্টারনেটে বিশৃঙ্খলা বা নেতিবাচকতা দেখতে দেখতে আমরা অনেক সময় আবেগহীন হয়ে পড়ি। একে বলা হয় ‘কম্প্যাশন ফ্যাটিগ’। যখন বাবা-মা নিজেরা সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেন, তখন তারা সন্তানের ছোটখাটো আবেগ বা কষ্টকেও গুরুত্ব দিতে চান না। এর ফলে সন্তান অত্যন্ত একা হয়ে বড় হয়।

 সন্তানের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব

আপনি হয়তো ভাবছেন ফোনে আপনি কী দেখছেন তার সাথে সন্তানের শারীরিক স্বাস্থ্যের কী সম্পর্ক? কিন্তু নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

নিদ্রাহীনতা এবং সন্তানের ঘুমের ব্যাঘাত:

অধিকাংশ অভিভাবক রাতে ঘুমানোর আগে বিছানায় শুয়ে ডুম স্ক্রোলিং করেন। ফোনের নীল আলো (Blue Light) মেলাটোনিন হরমোন তৈরি হতে বাধা দেয়, যা ঘুমের জন্য জরুরি। আপনি যখন রাত জেগে ফোন চালাবেন, আপনার পাশের সন্তানটিও সেই আলো এবং আপনার নড়াচড়ার কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারবে না। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া একটি শিশুর শারীরিক বিকাশে বড় বাধা।

শারীরিক অলসতা:

বাবা-মা যখন ফোনের স্ক্রিনে আটকে থাকেন, তখন তারা সন্তানদের নিয়ে বাইরে খেলতে যাওয়া বা ব্যায়াম করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে সন্তানও অলস হয়ে পড়ে, যা শৈশবে স্থূলতা বা ওবেসিটির বড় কারণ।

ইসলাম ও অভিভাবকের দায়িত্ব

ইসলামে সন্তানকে আল্লাহর দেওয়া এক মহান ‘আমানত’ হিসেবে ধরা হয়েছে। কিয়ামতের দিন প্রত্যেক অভিভাবককে জিজ্ঞাসা করা হবে তারা তাদের এই আমানতকে কীভাবে রক্ষা করেছেন।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন:

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে।” (সূরা আত-তাহরিম: ৬)

আপনার ডুম স্ক্রোলিং-এর অভ্যাস কেবল আপনার সময় নষ্ট করছে না, বরং এটি আপনাকে আপনার সন্তানের হক আদায় থেকে দূরে রাখছে। আপনি যখন স্ক্রল করতে ব্যস্ত থাকেন, তখন আপনি আপনার সন্তানের নৈতিক ও দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার মূল্যবান সময়টি নষ্ট করছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহিহ বুখারি)

ইন্টারনেটে নিরর্থক এবং নেতিবাচক খবর দেখে সময় পার করা এক ধরনের ডিজিটাল গুনাহ, যা আপনাকে আপনার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সময় অত্যন্ত মূল্যবান, আর সেই সময়কে যদি আমরা আমাদের সন্তানদের সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে ব্যয় না করি, তবে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।

ডুম স্ক্রোলিং-এর চক্র থেকে বের হয়ে আসার উপায়

অভিভাবক হিসেবে আপনি যদি চান আপনার সন্তান একটি সুস্থ পরিবেশে বড় হোক, তবে আজই আপনাকে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে:

১. নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন: দিনে সর্বোচ্চ ১৫-২০ মিনিট খবর দেখার জন্য বরাদ্দ রাখুন। এই সময় পার হয়ে গেলে আর কোনো নিউজে ক্লিক করবেন না।


২. সন্তানের সামনে ফোনের ব্যবহার কমান: আপনার সন্তান যখন আপনার সাথে থাকে, তখন ফোনটি অন্য ঘরে বা ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখুন। তাকে অনুভব করতে দিন যে আপনার কাছে ফোনের চেয়ে সে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


৩. বেডরুমকে ‘ফোন-ফ্রি’ জোন ঘোষণা করুন: শোবার ঘরে ফোন নেওয়া বন্ধ করুন। রাতে ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহারের বদলে সন্তানকে কোনো গল্প শোনান বা তার সারাদিনের কথা শুনুন।


৪. ডিজিটাল ডিটক্স: সপ্তাহে অন্তত একদিন পুরো পরিবার মিলে মোবাইল বা ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকুন। এই সময়টা প্রকৃতির সাথে বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে কাটান।


৫. নেতিবাচক পেজ আনফলো করুন: আপনার নিউজফিডে যেসব পেজ বা চ্যানেল কেবল বিতর্কিত এবং নেতিবাচক খবর প্রচার করে, সেগুলোকে আজই আনফলো বা ব্লক করে দিন।

আপনার সন্তানের নিরাপদ ডিজিটাল সঙ্গী

বর্তমান যুগে শিশুদের ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখা কঠিন। কিন্তু আপনি আপনার নিজের অভ্যাস বদলানোর পাশাপাশি সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেন।

কাহফ কিডস (Kahf Kids) অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে এই উদ্দেশ্যেই। আমরা জানি সোশ্যাল মিডিয়ার ডুম স্ক্রোলিং এবং নেতিবাচক অ্যালগরিদম শিশুদের জন্য কতটা ক্ষতিকর। তাই কাহফ কিডস-এ আমরা কোনো ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন, কোনো বাজে অ্যালগরিদম বা ডুম স্ক্রোলিং-এর সুযোগ রাখিনি।

এখানে আপনার সন্তান পাবে সম্পূর্ণ হালাল ও শিক্ষামূলক বিনোদন, যা তার চরিত্র গঠনে সাহায্য করবে। অভিভাবক হিসেবে আপনার ডুম স্ক্রোলিং-এর অভ্যাস যেমন ত্যাগের প্রয়োজন, তেমনি সন্তানের জন্য কাহফ কিডস-এর মতো নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করাও আপনার দায়িত্ব।

শেষ কথা

বাবা-মা হিসেবে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, স্মার্টফোনের স্ক্রিনের চেয়ে আমাদের সন্তানের চোখের ভাষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি আজ যে নেতিবাচক খবরের পেছনে সময় নষ্ট করছেন, তার কোনোটিই আপনার জীবনের শেষ সময়ে কাজে আসবে না।

কিন্তু আপনি যদি আজ ডুম স্ক্রোলিং-এর নেশা ছেড়ে আপনার সন্তানকে সঠিক সময় এবং মনোযোগ দেন, তবে সে একজন আত্মবিশ্বাসী ও সুন্দর মনের মানুষ হিসেবে বড় হবে।

আপনার এই ডিজিটাল আসক্তি যেন আপনার আদরের সন্তানের শৈশবকে কেড়ে না নেয়। আসুন, আমরা সচেতন হই। আমরা ঘৃণা আর ভয়ের খবর দেখা বন্ধ করি। আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য একটি ইতিবাচক, হাসিখুশি এবং নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলি।

মনে রাখবেন, আপনার সন্তান আপনার আয়না। আপনি যদি নিজেকে বদলাতে পারেন, তবে আপনার সন্তানও একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ পাবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের সন্তানদের ডিজিটাল ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

Similar Posts