|

কিভাবে ইসলামিক প্যারেন্টিং রোডম্যাপ তৈরি করবেন

নতুন বছরের শুরুতে আমরা কত কী ভাবি! নতুন একটা স্কিল শিখব, জমানো টাকা দিয়ে একটা প্রপার্টি কিনব, কিংবা শরীরের ওজন কমিয়ে ফিট হব। আমাদের ডায়েরির পাতায় আর্থিক, আধ্যাত্মিক আর ক্যারিয়ারের উন্নতির পরিকল্পনা গিজগিজ করে।

 কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আমরা কি কখনো ডায়েরিতে লিখেছি যে, আমার সন্তানকে আমি আগামী এক বছরে ঠিক কোন জায়গায় দেখতে চাই? আমরা কি আমাদের সন্তানদের বড় করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ‘প্যারেন্টিং গোল’ সেট করেছি? 

আজকের এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব কেন সন্তানকে কেবল ভাগ্যের ওপর ছেড়ে না দিয়ে একটি পরিকল্পিত উপায়ে বড় করা প্রয়োজন। আমরা জানব ইসলামিক প্যারেন্টিংয়ের তিনটি মূল স্তম্ভ ‘তালিম’, ‘তাহজিব’ এবং ‘তারবিয়াহ’ সম্পর্কে। এই প্রতিটি ধাপের জন্য একজন সচেতন বাবা-মায়ের নিজেকে ঠিক কী কী প্রশ্ন করা উচিত, তা নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি। আপনি যদি চান আপনার সন্তান কেবল নামেই মুসলিম না হয়ে বরং কোরআন ও সুন্নাহর আলোয় তার জীবনকে আলোকিত করুক, তবে আজকের এই রোডম্যাপটি আপনার চিন্তার জগত বদলে দেবে।

স্রোতে গা ভাসানো বনাম পরিকল্পিত প্যারেন্টিং

আমাদের মধ্যে অনেকেরই প্যারেন্টিং স্টাইল হলো ‘স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া’। অর্থাৎ, বাচ্চা বড় হচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে, সময়মতো পড়ছে, ব্যস! এর বাইরে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আমাদের থাকে না। আমরা ভাবি, বড় হলে এমনিতেই সব শিখে যাবে। কিন্তু যারা সচেতনভাবে নিজের সন্তানকে সুন্নাহর আলোয় বড় করতে চান, তাদের জন্য এই ‘উইং ইট’ (Winging it) বা হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিটি কখনোই কাজ করবে না।

একটি দালান তৈরি করতে যেমন ব্লু-প্রিন্ট লাগে, আপনার সন্তানকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও তেমনি একটি সুনির্দিষ্ট নকশা বা রোডম্যাপ প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানকে ‘ক’ থেকে ‘খ’ বিন্দুতে পৌঁছে দেওয়া, আর এই পুরো যাত্রায় আল্লাহর সাহায্য নিয়ে একটি সুনিপুণ পরিকল্পনা অনুসরণ করা। চলুন, এই পরিকল্পনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি।

১. তালিম (দ্বীনি শিক্ষা বা Religious Education)

প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে ‘তালিম’ শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। আমাদের দেশে অন্তত কোরআন পড়া শেখানোর গুরুত্বটা আমরা কমবেশি সবাই বুঝি। বাচ্চাকে হুজুরের কাছে দেওয়া বা মক্তবে পাঠানোটা আমাদের একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দ্বীনি শিক্ষা কি কেবল রিডিং পড়তে পারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

আপনার প্যারেন্টিং গোল ঠিক করার সময় নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন:

  • আমার সন্তানের দ্বীনি শিক্ষার ভিশন কী? 

কেবল কোরআন রিডিং পড়াই কি যথেষ্ট? নাকি আমি চাই সে কোরআনের অর্থ বুঝুক? এছাড়া সে কি ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ হাদিস মুখস্থ করবে? সে কি ফিকহ বা ইসলামের বুনিয়াদি নিয়মকানুনগুলো জানবে? সে কি ইসলামের ইতিহাস বা নবীদের জীবন (সিরাত) সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখবে?

  • আরবি ভাষার গুরুত্ব কতটুকু? 

যদি সম্ভব হয়, তাকে কি অন্তত কিছু কিছু আরবি বোঝার মতো দক্ষতা অর্জন করানো যায়? কারণ মূল ভাষার রস বুঝতে পারলে দ্বীনের সাথে তার সম্পর্ক আরও মজবুত হবে।

  • আমি এই লক্ষ্যগুলো কীভাবে অর্জন করব? 

কেবল স্বপ্ন দেখলেই হবে না, বাস্তবে সেটার জন্য আপনার হাতে কী কী রিসোর্স আছে? আপনি কি তাকে কোনো ভালো মাদরাসায় দেবেন, নাকি বাসায় শিক্ষক রাখবেন? নাকি আপনি নিজেই তাকে পড়াবেন? আপনার প্রতিদিনের রুটিনে এর জন্য কতটুকু সময় বরাদ্দ থাকবে?

মনে রাখবেন, ধর্ম সম্পর্কে ভাসা ভাসা জ্ঞান আমাদের সন্তানদের আধুনিক যুগের সংশয়বাদ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। গভীর জ্ঞানই তাদের ঈমানকে মজবুত করবে।

২. তাহজিব (আদব ও চরিত্র গঠন বা Discipline)

‘তাহজিব’ শব্দটি অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল শাসন নয়, বরং এটি একজন মানুষের আচরণ, আখলাক (সুন্দর চরিত্র) এবং ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলার এক অপূর্ব সমন্বয়। আমার কাছে মনে হয়, একজন মানুষের পরিচয় আসলে তার এই ‘তাহজিবে’র মাধ্যমেই ফুটে ওঠে।

কল্পনা করুন এমন একজন মানুষের কথা, যিনি কোরআনের হাফেজ, বুখারি শরিফের সব হাদিস মুখস্থ বলতে পারেন, কিন্তু তার আচরণে রুক্ষতা ভরা, সে মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করে কিংবা তার লেনদেন স্বচ্ছ নয়। এমন শিক্ষা কি তাকে সত্যিকার অর্থে কোনো উপকার করল? অবশ্যই না। যতক্ষণ না আমাদের আত্মা এবং চরিত্র ইসলামের শিক্ষাকে ধারণ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল মুখস্থ বিদ্যা আমাদের প্রকৃত মুসলিম বানাতে পারে না।

তাই তাহজিব নিয়ে ভাবার সময় এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করুন:

  • আমার সন্তানের জন্য কোন ধরনের শাসন বা ডিসিপ্লিন সবচেয়ে কার্যকর? 

মনে রাখবেন, শাসন মানেই বকাঝকা বা মারধর নয়। সুন্নাহর আলোকে কীভাবে তাকে ডিসিপ্লিন শেখানো যায়, তা নিয়ে ভাবুন।

  • কোন শিষ্টাচার বা আখলাক আমি তার মাঝে দেখতে চাই? 

বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, সত্য বলা, অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা এই গুণগুলো কি সে আমার মাঝে দেখতে পাচ্ছে?

  • আমি কীভাবে তাকে এই গুণগুলো অর্জনে সাহায্য করব?

 শিশু কি কেবল বই পড়ে আদব শিখবে? না, সে দেখবে আপনি কীভাবে আপনার প্রতিবেশীর সাথে কথা বলছেন বা আপনি রাগের মাথায় কী করছেন। নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করান। আপনার আচরণই হবে তার তাহজিব শেখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।

৩. তারবিয়াহ (ধর্মীয় লালন-পালন বা Religious Upbringing)

অনেকে মনে করেন তারবিয়াহ আর তালিম একই জিনিস। আসলে তা নয়। তালিম হলো তথ্য বা জ্ঞান দেওয়া, আর তারবিয়াহ হলো সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একজন মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেওয়ার প্রক্রিয়া। আপনি আপনার সন্তানের জন্য যে বিশাল স্বপ্ন বা ভিশন দেখছেন, সেই ভিশনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রতিদিন যে পরিশ্রম আর যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনি যাচ্ছেন তা-ই হলো তারবিয়াহ।

এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এই পর্যায়ে এসে আমাদের নিজেকে খুব কঠিন কিছু প্রশ্ন করতে হয়:

  • আমি আমার সন্তানকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই?

 ১০ বছর বা ২০ বছর পর সে যখন সমাজের মূল স্রোতে মিশবে, তখন তার আদর্শিক অবস্থান কী হবে?

  • আমি তাকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কী করছি? 

এই প্রশ্নটি সন্তানের চেয়ে বাবা-মায়ের নিজের ওপর বেশি কাজ করে। কারণ তারবিয়াহর ক্ষেত্রে আপনি প্রতিদিন যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছেন, তা আপনার সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলছে। আপনি কি সারাক্ষণ মোবাইলে ডুবে থেকে সন্তানকে বলছেন কোরআন পড়তে? আপনি কি মিথ্যা বলে সন্তানকে বলছেন সত্যবাদী হতে?

  • আমার ঘরোয়া পরিবেশ কি তারবিয়াহর জন্য উপযোগী?

 তারবিয়াহর জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশে আল্লাহর ভয় থাকবে, ভালোবাসা থাকবে এবং পারস্পরিক সম্মান থাকবে। আমাদের ঘরের প্রতিটি ছোট ছোট সিদ্ধান্ত আমরা কী দেখছি, কী খাচ্ছি, কার সাথে মিশছি সবই সন্তানের তারবিয়াহর অংশ।

বাবা-মা হিসেবে আমাদের অবস্থান

প্যারেন্টিং লক্ষ্য সেট করতে গিয়ে একটি মজার এবং গভীর বিষয় হলো যখনই আপনি আপনার সন্তানের জন্য কোনো লক্ষ্য ঠিক করবেন, দেখবেন অজান্তেই আপনাকে নিজের অনেক কিছু বদলাতে হচ্ছে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান নামাজি হোক, তবে আপনাকে সবার আগে জায়নামাজে দাঁড়াতে হবে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান বিনয়ী হোক, তবে আপনাকে নিজের অহংকার বিসর্জন দিতে হবে।

ইসলামিক প্যারেন্টিং আসলে কেবল সন্তানকে বড় করা নয়, এটি বাবা-মা হিসেবে আমাদের নিজেদেরও নতুন করে গড়ে তোলার একটি প্রক্রিয়া। এটি একটি আজীবন সাধনা বা ‘লাইফলং এন্ডেভার’। যারা অলরেডি বাবা-মা হয়েছেন, তারা জানেন যে এটি কত বড় এক আমানত। আর এই আমানত রক্ষা করার জন্য আমাদের সচেতন ও কৌশলী হতে হবে।

আপনার প্যারেন্টিং ডায়েরিতে আজই যা লিখবেন

আপনি যদি আজ থেকেই একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে চান, তবে একটি ডায়েরি নিয়ে বসুন এবং এই তিনটি কলাম করুন:

১. জ্ঞানের লক্ষ্য (তালিম): 

আগামী এক বছরে আমার সন্তান কতটুকু জানবে? (যেমন: ১০টি হাদিস, ৫টি ছোট সূরা এবং নবীদের ৩টি গল্প)।

২. চরিত্রের লক্ষ্য (তাহজিব): 

আমি তার কোন খারাপ অভ্যাসটি দূর করতে চাই এবং কোন ভালো গুণটি যুক্ত করতে চাই? (যেমন: রাগ নিয়ন্ত্রণ এবং খাবার শেষে শুকরিয়া আদায় করা)।

৩. প্রক্রিয়ার লক্ষ্য (তারবিয়াহ): 

এই গুণগুলো আনার জন্য আমার নিজের কোন অভ্যাসটি বদলাতে হবে? (যেমন: প্রতিদিন মাগরিবের পর সবাই মিলে একসাথে বসে দ্বীনি আলোচনা করা)।

শেষ কথা

আমরা যদি আজ আমাদের সন্তানদের জন্য কোনো লক্ষ্য ঠিক না করি, তবে এই পৃথিবী তাদের জন্য লক্ষ্য ঠিক করে দেবে। সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি এবং বাইরের পরিবেশ তাদের শিখিয়ে দেবে তাদের পরিচয় কী হওয়া উচিত। আর সেই পরিচয় হয়তো আপনার স্বপ্নের সাথে মিলবে না। তাই সময় থাকতেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের লালন-পালনকে কেবল একটি প্রাত্যহিক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে বরং একটি মিশন হিসেবে গ্রহণ করি। আমাদের ভিশন হোক তাদের কোরআন ও সুন্নাহর আলোয় গড়ে তোলা, যাতে তারা কেবল ইহকালেই নয়, পরকালেও আমাদের জন্য সদকায়ে জারিয়া এবং চোখের শীতলতা হয়ে থাকে।

Similar Posts