|

সন্তানের জন্য ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করার কিছু উপায়

আপনার সন্তান যখন বড় হবে, তখন সে কি নিজেই বুঝতে পারবে যে সে একজন মুসলিম? নাকি ইসলাম তার কাছে শুধু একটা পরিচয়পত্রের নাম হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নটা অনেক বাবা-মায়ের মনেই আসে, কিন্তু উত্তর খোঁজার চেষ্টা কম মানুষই করেন। আজকের এই ব্লগটা তাদের জন্যই লেখা।

এই ব্লগে আমরা জানব  ইসলামিক পরিবেশ আসলে কী, কেন এটা দরকার, এবং ঘরে বসেই কীভাবে সন্তানের জন্য একটা সুন্দর ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করা যায়। বিশেষত যারা মুসলিম সংখ্যালঘু দেশে বা বিদেশে থাকেন, তাদের জন্য এই বিষয়গুলো আরও বেশি কাজে আসবে।

সন্তানের জন্য ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করার কিছু উপায়

ইসলামিক পরিবেশ মানে আসলে কী?

অনেক বাবা-মা মনে করেন, সন্তানকে ভালো ইসলামিক পরিবেশ দিতে হলে মুসলিম দেশে থাকতে হবে, কিংবা আরবে বসবাস করতে হবে। এই ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আপনি পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, নিজের ইচ্ছা আর সঠিক চেষ্টা থাকলে সন্তানের জন্য একটা সুন্দর ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

ইসলামিক পরিবেশ মানে এই না যে আপনার সন্তান শুধু মুসলিমদের সাথে মিশবে, শুধু নির্দিষ্ট কিছু খাবার খাবে বা অমুসলিমদের এড়িয়ে চলবে। ইসলামিক পরিবেশ হলো এমন একটা জগৎ যেখানে শিশু প্রতিদিনের জীবনের মধ্য দিয়ে ইসলামকে চেনে, বোঝে এবং ভালোবাসে। এটা তৈরি হয় ঘরের ভেতরে, বাইরে, মানুষের সাথে সম্পর্কে এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসে।

শিশু যে পরিবেশে বড় হয়, সেই পরিবেশই তাকে গড়ে তোলে। সে যাদের সাথে মেশে, যা দেখে, যা শোনে এবং যেভাবে কথা বলতে শেখে  সবই তার ব্যক্তিত্বের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করা মানে সেই প্রভাবগুলোকে সচেতনভাবে ইসলামের দিকে নিয়ে যাওয়া।

কেন ইসলামিক পরিবেশ দরকার?

ইসলাম কোনো বইয়ের ধর্ম না। এটা আমাদের জীবনযাপনের পদ্ধতি। তাই এটাকে শুধু মাদরাসায় বা ক্লাসরুমে শেখালেই হয় না। সন্তানের দৈনন্দিন জীবনে যদি ইসলামের ছাপ না থাকে, তাহলে পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা একসময় মুছে যায়।

আজকের দুনিয়ায় শিশুরা অনেক রকম প্রভাবের মধ্যে বড় হচ্ছে। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন, বন্ধুদের প্রভাব এসব জায়গা থেকে নানা ধরনের চিন্তা ও মূল্যবোধ শিশুর মনে ঢুকে পড়ে। এই অবস্থায় যদি ঘরে একটা শক্তিশালী ইসলামিক পরিবেশ না থাকে, তাহলে শিশু তার নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় পড়তে পারে। সে বুঝতে পারে না সে আসলে কে এবং কোন মূল্যবোধ মেনে চলা উচিত।

ইসলামিক পরিবেশ সন্তানের মনে একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে সে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের পরিচয় ধরে রাখতে পারে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারে যে আমি মুসলিম এবং আমি এতে গর্বিত।

১. ঘরের জীবনযাপনকে ইসলামিক করুন

একটু ভাবুন , এখন যদি কোনো অপরিচিত মানুষ আপনার বাড়িতে কিছুক্ষণ কাটায়, সে কি বুঝতে পারবে এটা একটা মুসলিম পরিবারের ঘর?

এই প্রশ্নটা ওয়ালে ঝোলানো আরবি ক্যালিগ্রাফির কথা না। এটা হলো আপনি কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে খাবার শুরু করেন, পরিবারের সাথে কেমন ব্যবহার করেন, রাগের সময় কী বলেন, খুশির সময় কী বলেন।

শিশু সবচেয়ে বেশি শেখে দেখে। বাবা-মা যদি প্রতিদিন সালাম দেন, খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলেন, ভালো কিছু হলে আলহামদুলিল্লাহ বলেন এবং কষ্টের সময় ইন্নালিল্লাহ পড়েন তাহলে শিশু স্বাভাবিকভাবেই এই অভ্যাসগুলো নিজের মধ্যে নিয়ে নেয়। কারণ এটাই তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়, এটাই সে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে।

সন্তানকে প্রশংসা করার সময় শুধু “বাহ, ভালো করেছ” না বলে বলুন “মাশাআল্লাহ, অনেক ভালো করেছ।” কারো জন্য দোয়া করতে শিখিয়ে দিন। নামাজের সময় হলে সন্তানকে পাশে নিন, জোর না করে আগ্রহী করুন। রমজানে রোজার আনন্দটা পরিবারের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিন। ঈদকে উৎসবের মতো উদযাপন করুন যাতে সন্তানের মনে ইসলামি দিনগুলো সুখের স্মৃতি হয়ে থাকে।

ঘরে কুরআনের তেলাওয়াত চালিয়ে রাখার অভ্যাসও সন্তানের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ছোটবেলা থেকে কুরআনের শব্দ কানে গেলে সেটা পরিচিত লাগে, অচেনা না। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই সন্তানের মনে গেঁথে যায় এবং ঘরটাকে একটা জীবন্ত ইসলামিক পরিবেশে পরিণত করে।

২. শেখার উপকরণ হাতের কাছে রাখুন

একটা শিশু যে বইগুলো পড়ে, যে গল্পগুলো শোনে, যে ভিডিওগুলো দেখে  সেগুলো তার মনের ভেতরে একটা জগৎ তৈরি করে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আপনার সন্তানের হাতের কাছে এগুলো কী আছে?

শিশুদের জন্য লেখা নবী-রাসুলদের গল্পের বই, সিরাতের বই, ইসলামিক রঙ করার বই, ছোটদের উপযোগী অডিও গল্প এবং ইসলামিক কার্টুন  এসব যদি ঘরে থাকে এবং সহজেই পাওয়া যায়, তাহলে শিশু নিজে থেকেই সেদিকে আগ্রহী হবে। শিশু যা সহজে পায়, তার দিকেই বারবার ফিরে যায়।

ডিজিটাল ডিভাইসের এই যুগে সন্তানকে নিরাপদ রাখতে ব্যবহার করতে পারেন ‘কাহফ কিডস’ (Kahf Kids) অ্যাপটি। এটি ইউটিউবের একটি চমৎকার হালাল বিকল্প, যেখানে কোনো ক্ষতিকর অ্যাড বা অ্যালগরিদম ছাড়াই শিশুরা সম্পূর্ণ ফ্রিতে ইসলামিক ভিডিও ও কার্টুন দেখতে পারে। এছাড়া এতে আছে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, স্ক্রিন টাইম লিমিট, আল-কুরআন এবং সৃজনশীল গেম যা আপনার সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর ইসলামিক ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

বইগুলো শেলফের উঁচুতে না রেখে এমন জায়গায় রাখুন যেখানে শিশু নিজেই নাগাল পেতে পারে। যখন শিশু নিজে হাত বাড়িয়ে একটা বই তুলে পড়তে শুরু করে, সেটাই সবচেয়ে ভালো লক্ষণ। এর মানে হলো সে নিজে থেকেই জানতে চাইছে।

বই বা ভিডিও দেখার পর সন্তানের সাথে একটু আলোচনা করুন। জিজ্ঞেস করুন যে  “তুমি কী শিখলে?” বা “নবী (সা.) সেখানে কী করেছিলেন?” বা “তুমি যদি সেখানে থাকতে, কী করতে?” এই ছোট্ট কথোপকথনগুলো শিক্ষাকে মনের গভীরে বসিয়ে দেয় এবং সন্তানের চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করে। পাশাপাশি বাবা-মার সাথে সন্তানের একটা সুন্দর সম্পর্কও গড়ে ওঠে।

৩. সঠিক সমাজ ও মানুষ বেছে নিন

রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। তাই আপনার সন্তান যাদের সাথে মেশে, তারা কেমন  এই বিষয়টা নিয়ে সচেতন থাকা খুব জরুরি।

এর মানে এই না যে অমুসলিম প্রতিবেশী বা বন্ধুদের এড়িয়ে যেতে হবে। বরং মানে হলো  একই রকম ইসলামিক মূল্যবোধ ধারণ করে এমন পরিবারগুলোর সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন এবং সন্তানকে সেই পরিবারের বাচ্চাদের সাথে মেশার সুযোগ দিন।

মসজিদের পরিবারগুলো, ঈদের মাঠে দেখা মানুষজন, ইসলামিক স্কুলের বন্ধু বা তাদের পরিবার  এই মানুষগুলো মিলেই আপনার সন্তানের চারপাশে একটা ইসলামিক সমাজ গড়ে ওঠে। ঘরে আপনি যা শেখান, বাইরের এই মানুষগুলো সেটাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সন্তান যখন দেখে শুধু তার পরিবার না, আরও অনেক মানুষ একইভাবে চলেন তখন ইসলামকে তার কাছে আরও স্বাভাবিক মনে হয়।

সন্তানকে মসজিদে নিয়ে যান। ইসলামিক ইভেন্ট বা পারিবারিক হালকায় যোগ দিন। একসাথে অন্য মুসলিম পরিবারের সাথে সময় কাটান। এই অভিজ্ঞতাগুলো সন্তানের মনে ইসলামকে একটা আনন্দের এবং ভালোবাসার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলে।

শেষ কথা

সন্তানকে ভালো ইসলামিক পরিবেশ দেওয়া নির্ভর করে না আপনি কোন দেশে থাকেন তার উপর। এটা নির্ভর করে আপনার প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের উপর । আপনি ঘরে কী বলেন, কীভাবে চলেন, কোন মানুষদের সাথে সময় কাটান এবং সন্তানের হাতে কী তুলে দেন।

ইসলামিক পরিবেশ কোনো একদিনে তৈরি হয় না। এটা তৈরি হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট চেষ্টায়, ধৈর্যে এবং আল্লাহর উপর ভরসায়। ঘরের পরিবেশ, সঠিক উপকরণ আর ভালো মানুষের সাথে পরিচয়  এই তিনটি মিলিয়েই আপনার সন্তান একদিন নিজেই বুঝবে সে কে এবং কেন সে মুসলিম। আপনার প্রতিটি ছোট চেষ্টাই একটা বিনিয়োগ  যার ফল পাবেন দুনিয়ায় এবং আখিরাতেও। ইনশাআল্লাহ।

Similar Posts