মা-বাবা হওয়ার পর আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে একটি স্বপ্ন খুব যত্ন করে লালিত হয়। আমাদের সন্তান যেন কোরআনের হাফেজ হয়, কিংবা অন্তত কোরআনকে মন থেকে ভালোবাসতে শেখে। আমরা চাই তারা কোরআন পড়ুক, মুখস্থ করুক এবং বড় হয়ে কোরআনের আদর্শে নিজেদের জীবন সাজাক।
কিন্তু বাস্তব জীবন অনেক সময় আমাদের এই স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো আপনি অনেক আগ্রহ নিয়ে বাচ্চাকে কোরআন শেখানো শুরু করলেন, কিন্তু কয়েকদিন পরেই দেখলেন আপনি নিজেই ব্যস্ততার কারণে কোরআন খোলার সময় পাচ্ছেন না। অথবা আপনার সন্তান কোরআন পড়তে বসছে ঠিকই, কিন্তু সেটা কেবলই একটা ‘কাজ’ হিসেবে, ভালোবাসা থেকে নয়।
কোরআনকে ভালোবাসা একটি সারাজীবনের সাধনা। এটি কেবল স্কুলে পাঠিয়ে বা হুজুর রেখে দেওয়ার বিষয় নয়। বরং এটি একজন মুমিন সন্তান গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজকের এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব এমন কিছু বাস্তবসম্মত উপায় নিয়ে, যা আপনার সন্তানের মনে কোরআনের প্রতি এক অটুট ভালোবাসা তৈরি করবে।
আমরা জানবো দোয়ার শক্তি, নিজেদের আচরণের প্রভাব এবং ঘরোয়া পরিবেশে কোরআনের আবহাওয়া তৈরি করার কৌশলগুলো নিয়ে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান কেবল বাধ্য হয়ে নয়, বরং ভালোবেসে কোরআনকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু বানিয়ে নিক, তবে আজকের এই আলোচনাটি আপনার জন্য এক নতুন দিশারি হয়ে উঠবে।

আল্লাহর কাছে প্রাণখুলে দোয়া করুন
আমরা অনেক সময় শুধু বাহ্যিক চেষ্টার ওপর নির্ভর করি, কিন্তু ভুলে যাই যে অন্তরের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আপনি যত চেষ্টাই করুন না কেন, আল্লাহ যদি কোনো অন্তরে হিদায়াত বা মহব্বত না দেন, তবে সেই হৃদয় কোনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয় না। তাই সন্তানকে কোরআনমুখী করার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। এটি আপনার প্রতিদিনের দোয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।
ইতিহাসের সেরা মা-বাবাদের দিকে তাকালে আমরা দেখি, তাদের সন্তানেরা যে আজ স্মরণীয় হয়ে আছেন, তার পেছনে ছিল তাদের মা-বাবার গভীর আর্তি। হযরত ঈসা (আ.)-এর নানি অর্থাৎ হযরত মারইয়াম (আ.)-এর মায়ের কথা চিন্তা করুন। তিনি যখন গর্ভবতী ছিলেন, তখন থেকেই তিনি দোয়া করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে সেই কথাটি এভাবে এসেছে:
“অতঃপর যখন তিনি তাকে প্রসব করলেন, তখন বললেন, ‘হে আমার রব! আমি তো এক কন্যা প্রসব করেছি।’ আর তিনি যা প্রসব করেছেন আল্লাহ তা খুব ভালো করেই জানেন। ‘আর ছেলেটি তো মেয়েটির মতো নয়। আর আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম এবং আমি তাকে ও তার বংশধরকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আপনার আশ্রয়ে দিচ্ছি।’” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩৬)
তাই সন্তানকে কোরআন শেখানোর আগে নিজের হাতটি আল্লাহর দরবারে তুলুন। বলুন, “হে আল্লাহ, আমার সন্তানের হৃদয়কে তোমার কালামের জন্য উন্মুক্ত করে দাও।”
সঠিক সময়ে ও সঠিক উপায়ে শিক্ষা শুরু করা
অনেক সময় আমরা মনে করি, বাচ্চা একটু বড় হোক, স্কুলে যাওয়া শিখুক, তারপর কোরআন শেখাব। কিন্তু শেখানোর আসল সময় হলো যখন সে কথা বলা শুরু করে। এমনকি জন্মের পর থেকেই যদি সে বাড়িতে কোরআনের শব্দগুলো শুনতে থাকে, তবে তার মস্তিষ্কে এই সুরগুলো স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।
শৈশব থেকেই শুরু
শিশু যখন আধো-আধো কথা বলা শেখে, তখনই ছোট ছোট সূরা বা জিকির শেখানোর মাধ্যমে তার কোরআন-হাদিস শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করা যায়।
নিয়মিত চর্চা
সন্তানকে নিজে বাড়িতে পড়ান অথবা কোনো ভালো মাদরাসায় বা শিক্ষকের কাছে ভর্তি করিয়ে দিন।
স্পর্শের প্রভাব
শিশুরা যখন বারবার কোরআনের সংস্পর্শে আসে, তখন অবচেতনভাবেই তাদের হৃদয়ে কোরআনের জন্য একটি বিশেষ জায়গা তৈরি হয়। আপনি যত বেশি কোরআনের সাথে সময় কাটাবেন, আপনার মনে এর মহব্বত তত বাড়বে।
কোরআনের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রদর্শন করুন
সন্তানকে কিছু শেখানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো তার সামনে উদাহরণ তৈরি করা, যা আধুনিক প্যারেন্টিং-এর অন্যতম মৌলিক নীতি।
শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে যা দেখে তা বেশি অনুকরণ করে। আপনি যদি সন্তানকে কোরআন পড়ার নির্দেশ দিয়ে নিজে মোবাইল বা টিভি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তবে সে কখনোই কোরআনের প্রতি আগ্রহ বোধ করবে না।
আপনার সন্তানকে দেখতে দিন যে আপনি কোরআনকে কতোটা ভালোবাসেন।
তাকে দেখতে দিন যে আপনি প্রতিদিন সকালে কোরআন নিয়ে বসছেন।
তাকে বুঝতে দিন যে আপনি কোরআনের অর্থ বোঝার চেষ্টা করছেন এবং এটি আপনার জীবনে আনন্দ নিয়ে আসছে।
যখন সে দেখবে তার প্রিয় মা বা বাবা কোরআন পড়লে শান্ত ও খুশি থাকেন, তখন সে নিজেও সেই আনন্দের ভাগ নিতে চাইবে।

কোরআন নিয়ে তাদের সাথে কথা বলুন
কোরআন কেবল পড়ার বিষয় নয়, এটি গল্প করার বিষয়। কোরআনে এমন সব চমৎকার কাহিনী আছে যা যেকোনো রূপকথা বা ফিকশনকেও হার মানায়।
নবীদের গল্প
তাদের সাথে হযরত মূসা (আ.), হযরত নূহ (আ.) বা আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর জীবনের রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলো শেয়ার করুন।
এ ধরনের গল্প বলার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে দৈনন্দিন ইসলামিক অভ্যাস গড়ে তুললে তারা ইসলামকে শুধু জানবে না, বরং জীবনেও বাস্তবায়ন করবে।
জান্নাতের বর্ণনা
কোরআনে জান্নাতের যে সুন্দর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা তাদের শোনান। দুধের নদী, সুস্বাদু ফল আর চিরশান্তির সেই জায়গার কথা শুনে তারা উৎসাহিত হবে।
আল্লাহর নিদর্শন
প্রকৃতিতে আল্লাহর যে সব নিদর্শন ছড়িয়ে আছে—চাঁদ, তারা, পাহাড়, সমুদ্র—এগুলো নিয়ে কথা বলার সময় কোরআনের আয়াতগুলো স্মরণ করিয়ে দিন।
বাড়িতে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করুন
এটি একটি পরীক্ষিত ও সফল পদ্ধতি। অনেক শিশু আছে যারা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসায় যায় না, কিন্তু বাড়িতে সারাক্ষণ কোরআনের তেলাওয়াত শোনার কারণে তাদের মনে কোরআনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা তৈরি হয়েছে।
আজকাল শিশুরা কার্টুন বা খেলনার প্রতি কেন এত আসক্ত হয়? কারণ তাদের চোখের সামনে সারাক্ষণ এগুলো থাকে। ঠিক একইভাবে যদি বাড়িতে নিয়মিত কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াত বাজে বা পরিবারের সদস্যরা পাঠ করে, তবে শিশুটি সেই আবহাওয়ায় বড় হবে।
এমন পরিবেশে বড় হওয়া শিশুর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামিক অভ্যাস গড়ে উঠতে শুরু করে।
গাড়ি চালানোর সময় মিউজিকের বদলে কোরআন তেলাওয়াত ছেড়ে রাখুন।
বাচ্চা যখন খেলছে বা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন খুব মৃদু স্বরে কোরআন বাজিয়ে রাখতে পারেন।
তার সামনে নিজে একটু উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করুন যাতে সে শব্দের উচ্চারণ ও সুর শুনতে পায়।
এই অবিরাম শ্রবণ শিশুকে কোরআনের সাথে পরিচিত করায় এবং এক সময় সে নিজে থেকেই সেই সুরগুলো গুনগুন করতে শুরু করে।
যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে বসেই সহজে ও শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াতের জন্য কাহফ কিডস (Kahf Kids) অ্যাপটি আপনার সন্তানের সঙ্গী হতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি তাদের মনোযোগ, পড়াশোনা এবং দ্বীনি শিক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তখন নিরাপদ ও উপকারী ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
মা-বাবাদের জন্য কিছু বিশেষ পরামর্শ
কোরআনকে ভালোবাসা একটি যাত্রা, কোনো গন্তব্য নয়। এটি মূলত ইসলামিক পদ্ধতিতে সন্তান লালন-পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জোর করবেন না
কোরআন শেখানো যেন বাচ্চার কাছে বোঝা বা শাস্তির মতো না মনে হয়। যদি সে একদিন পড়তে না চায়, তবে জোর না করে তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলুন বা তাকে দিয়ে শুধু তেলাওয়াত শোনান।
পরিবেশ তৈরি করুন
ঘরে কোরআন শরীফ একটি সম্মানজনক এবং সুন্দর জায়গায় রাখুন। মাঝে মাঝে সন্তানকে সাথে নিয়ে কোরআনের ধুলো পরিষ্কার করুন, যাতে সে ছোটবেলা থেকেই কিতাবটির মর্যাদা বুঝতে পারে।
ছোট অর্জনগুলো উদযাপন করুন
আপনার সন্তান যখন একটি ছোট সূরা বা আয়াত মুখস্থ করবে, তাকে জড়িয়ে ধরুন, প্রশংসা করুন বা ছোট কোনো উপহার দিন। তাকে বুঝতে দিন যে এটি একটি মহৎ কাজ।
প্রশ্ন করতে দিন
কোরআন নিয়ে তার মনে যেকোনো প্রশ্ন জাগলে বিরক্ত হবেন না। বরং তার সাথে কথা বলুন, হাসিমুখে উত্তর দিন। এতে তার কৌতূহল বাড়বে।
শেষ কথা
আমাদের সন্তানদের কোরআনপ্রেমী হিসেবে গড়ে তোলা কেবল একটি ধর্মীয় কাজ নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্বও বটে। কারণ একজন মুমিন সন্তান গড়ে তোলার ভিত্তি হলো কোরআনের সাথে তার সম্পর্ককে দৃঢ় করা।
মনে রাখবেন, আজকের এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই কাল আপনার সন্তানের চরিত্রে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
আমরা দোয়া করি, আল্লাহ যেন আমাদের প্রত্যেকের সন্তানকে কোরআনের খাদেম হিসেবে কবুল করেন এবং আমাদের পরিবারগুলোকে কোরআনের নূরে আলোকিত করে দেন। আমিন।
