আজকাল আমরা যখনই ফেসবুক বা ইউটিউব ব্যবহার করি, চোখের সামনে এমন কিছু ভিডিও চলে আসে যা দেখে আমাদের রক্ত গরম হয়ে যায়। হতে পারে সেটি কোনো বাচ্চার প্রতি অমানবিক আচরণের দৃশ্য, আমাদের ধর্ম নিয়ে কোনো কটূক্তি, অথবা এমন কোনো অদ্ভুত ভিডিও যেখানে খাবার নষ্ট করা হচ্ছে বা সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে।
আমরা বাবা-মা হিসেবে খুব দ্রুত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আমরা ভাবি, “এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিত” এবং সাথে সাথে সেই ভিডিওতে কমেন্ট করি বা অন্যদের সাবধান করতে শেয়ার করি। কিন্তু এই যে আপনি রেগে গিয়ে রিয়্যাক্ট করলেন, এটাই ছিল সেই ভিডিও মেকারের আসল উদ্দেশ্য। একেই বলা হয় ‘রেজ বেইট’ (Rage Bait)। একজন অভিভাবক হিসেবে আপনাকে এই ডিজিটাল ফাঁদ সম্পর্কে কিছু ধ্রুব সত্য জানতে হবে, যা আপনার মানসিক শান্তি এবং পরিবারের পরিবেশ রক্ষা করবে।
রেজ বেইট আসলে অভিভাবকদের কেন টার্গেট করে?
কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা জানে যে, সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে অভিভাবকদের আবেগ সবচেয়ে বেশি। আপনি আপনার সন্তানকে ভালোবাসেন, আপনার ধর্মকে শ্রদ্ধা করেন এবং আপনার কিছু সামাজিক মূল্যবোধ আছে। রেজ বেইট ভিডিওগুলো ঠিক এই জায়গাগুলোতেই আঘাত করে।
তারা এমন ভিডিও বানাবে যেখানে দেখানো হবে “আপনার সন্তান এই খাবারটি খেলে মারা যেতে পারে” (যা হয়তো পুরোপুরি মিথ্যা) অথবা কোনো একটি ধর্মীয় বিষয়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করবে। তারা জানে, একজন সাধারণ মানুষ হয়তো এটি এড়িয়ে যাবে, কিন্তু একজন বাবা বা মা হিসেবে আপনি চুপ থাকতে পারবেন না। আপনার এই ‘চুপ থাকতে না পারা’ বা আবেগই হলো তাদের ব্যবসার প্রধান হাতিয়ার। তারা আপনার ভয় এবং নৈতিকতাকে পুঁজি করে টাকা আয় করছে।
আপনার প্রতিটি ‘অ্যাংরি রিঅ্যাকশন’ তাদের পকেটে টাকা ভরছে
আমরা অনেকেই মনে করি, কোনো বাজে ভিডিওতে ‘অ্যাংরি’ (Angry) ইমোজি দিলে বা গালাগালি করে কমেন্ট করলে সেই লোকটির ক্ষতি হবে। কিন্তু সত্য হলো ঠিক উল্টো। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম (ফেসবুক বা ইউটিউব যেভাবে কাজ করে) রাগ আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য বোঝে না।
তাদের কাছে ‘এনগেজমেন্ট’ বড় কথা। আপনি যখন কোনো ভিডিওতে কমেন্ট করেন, অ্যালগরিদম মনে করে এই ভিডিওটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই সে এটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। আপনি যত বেশি রাগের মাথায় কমেন্ট করছেন, ভিডিওটি তত বেশি ভাইরাল হচ্ছে। দিনশেষে সেই ক্রিয়েটর আপনার রাগের ওপর ভিত্তি করেই কয়েক হাজার ডলার আয় করে নিচ্ছে। অর্থাৎ, আপনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অজান্তেই সেই অন্যায়কারীকে আর্থিকভাবে সাহায্য করছেন।
গবেষণার চোখে রেজ বেইট ও অভিভাবকদের মানসিক অবস্থা
লন্ডন ইউনিভার্সিটি এবং বিভিন্ন আমেরিকান গবেষণা সংস্থা ‘রেজ বেইট’ নিয়ে কাজ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের মস্তিষ্ক নেতিবাচক বা রাগের উদ্রেককারী তথ্যে খুব দ্রুত সাড়া দেয়। একে বলা হয় ‘নেগেটিভিটি বায়াস’।
অভিভাবকদের ওপর করা একটি জরিপে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত এই ধরনের উসকানিমূলক কন্টেন্ট দেখেন, তাদের মধ্যে ‘প্যারেন্টাল এনজাইটি’ বা সন্তান নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা অনেক বেড়ে যায়। তারা সারাক্ষণ এক ধরণের ভয়ে থাকেন যে তাদের চারপাশের পৃথিবীটা বোধহয় খুব খারাপ হয়ে গেছে। এই ভয় তাদের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং তারা সন্তানদের ওপর অতিরিক্ত কড়াকড়ি শুরু করেন, যা পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে।
শিশুদের ওপর এর পরোক্ষ প্রভাব
আপনি যখন ঘরে বসে কোনো রেজ বেইট ভিডিও দেখে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন বা ফোনে ঝগড়া করছেন, আপনার সন্তান আপনাকে লক্ষ্য করছে। সে শিখছে যে, ইন্টারনেটে কাউকে গালি দেওয়া বা চিৎকার করাটা স্বাভাবিক।
গবেষণা বলছে, যেসব বাবা-মা ইন্টারনেটে বেশি আগ্রাসী (Aggressive) থাকেন, তাদের সন্তানরাও পরবর্তী জীবনে ডিজিটাল বুলিং বা অনলাইনে অন্যকে হেনস্তা করার কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাই আপনার ফোনের স্ক্রিনে আপনি কী দেখছেন এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, তার ওপর আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ভর করছে।
ইসলাম ও সংবাদ যাচাইয়ের গুরুত্ব
একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আমাদের ইসলামের শিক্ষা মনে রাখা জরুরি। ইসলাম কোনো সংবাদ না জেনে বা হুজুগে পড়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতে নিষেধ করেছে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে পরিষ্কারভাবে বলেছেন:
“হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করো, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়।” (সূরা আল-হুজুরাত: ৬)।
রেজ বেইট কন্টেন্টগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিথ্যা বা আংশিক সত্য হয়। আপনি যখন তা যাচাই না করে শেয়ার করেন বা কমেন্ট করেন, তখন আপনি এই কোরআনের আয়াতের লঙ্ঘন করছেন। সত্যতা যাচাই না করে কোনো কিছু ছড়ানো মানেই হলো মিথ্যার প্রসারে সাহায্য করা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বলে বেড়ায়।” (সহিহ মুসলিম)।
তাই ইন্টারনেটে কোনো কিছু দেখে সাথে সাথে তা বিশ্বাস করা বা সেটির পেছনে সময় নষ্ট করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
রেজ বেইট আপনার ঘরোয়া শান্তি নষ্ট করছে
রেজ বেইট কন্টেন্টগুলো আমাদের মস্তিষ্ককে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে নিয়ে যায়। এর ফলে আমাদের রক্তচাপ বাড়ে এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। আপনি হয়তো ফেসবুকের কোনো একটা বাজে ভিডিও দেখে রেগে আছেন, ঠিক সেই সময় আপনার সন্তান আপনার কাছে কোনো আবদার নিয়ে এলো। দেখা যাবে, আপনি ইন্টারনেটের সেই রাগ আপনার সন্তানের ওপর ঝাড়ছেন।
এভাবে রেজ বেইট আপনার অজান্তেই আপনার মধুর পারিবারিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো ঘরকে প্রশান্তির জায়গা বানানো, কিন্তু ডিজিটাল এই বিষ ঘরের ভেতরে অশান্তি টেনে আনছে।
কীভাবে এই ফাঁদ থেকে বাঁচবেন? (অভিভাবকদের করণীয়)
ক. রিয়্যাক্ট করা বন্ধ করুন:
সবচেয়ে বড় সমাধান হলো অদেখা করা বা ইগনোর করা। আপনি যদি কোনো ভিডিওতে ক্লিক না করেন, রিঅ্যাকশন না দেন এবং কমেন্ট না করেন, তবে সেই ভিডিওটি আর বাড়বে না। মনে রাখবেন, আপনার নীরবতাই হলো সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।
খ. অ্যালগরিদম ঠিক করুন:
আপনার ফেসবুক বা ইউটিউব ফিডে যদি বারবার এমন ভিডিও আসে, তবে ভিডিওর পাশে থাকা তিনটি ডটে ক্লিক করে ‘Not Interested’ অথবা ‘Report’ করুন। এভাবে আপনি ফেসবুককে বুঝিয়ে দেবেন যে আপনি এই ধরণের নোংরামি দেখতে চান না।
গ. নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম বেছে নিন:
আপনার সন্তানকে ইউটিউব বা ফেসবুকের ক্ষতিকর অ্যালগরিদম এবং ‘রেজ বেইট’ কন্টেন্ট থেকে দূরে রাখতে ব্যবহার করতে পারেন ‘কাহফ কিডস’ (Kahf Kids) অ্যাপ। এটি ইউটিউবের একটি নিরাপদ ও হালাল বিকল্প, যেখানে কোনো বিজ্ঞাপন বা ক্ষতিকর অ্যালগরিদম নেই। ফলে আপনার সন্তান কোনো উসকানিমূলক বা আজেবাজে ভিডিওর ফাঁদে না পড়ে সৃজনশীল গেম, আল-কুরআন এবং শিক্ষামূলক কার্টুন দেখার সুযোগ পাবে। এটি আপনার ডিভাইসের ক্ষতিকর অ্যাপ ও সাইট ব্লক করে সন্তানের জন্য একটি সুস্থ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
ঘ. খবর বা তথ্যের সঠিক উৎস খুঁজুন:
কোনো সস্তা ভিডিও থেকে তথ্য না নিয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদপত্র বা বিশ্বস্ত মাধ্যম থেকে খবর জানুন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য বা ধর্ম বিষয়ক কোনো কথা হুজুগে বিশ্বাস করবেন না।
ঙ. সন্তানদের সাথে আলোচনা করুন:
আপনার সন্তান যখন বড় হবে, তাকেও এই রেজ বেইট সম্পর্কে বোঝান। তাকে শেখান যে ইন্টারনেটে যা দেখা যায় তার সব সত্য নয় এবং লাইক-কমেন্টের জন্য মানুষ অনেক নিচু কাজও করতে পারে।
চ. জিকির ও ধৈর্যের অভ্যাস:
যখনই কোনো কিছু দেখে রাগ হবে, তখনই ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। শয়তান চায় আপনি উত্তেজিত হয়ে কোনো ভুল কাজ বা কথা বলুন। তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন।
শেষ কথা
অভিভাবক হিসেবে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের সন্তানের জন্য উদাহরণ। রেজ বেইট হলো বর্তমান যুগের একটি ফিতনা, যা আমাদের আবেগ নিয়ে ব্যবসা করে। আমরা যদি সচেতন না হই, তবে আমাদের মানসিক শান্তি এবং আমাদের সন্তানের সুন্দর শৈশব এই ডিজিটাল ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে।
কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী আমাদের উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং যেকোনো তথ্য যাচাই করে গ্রহণ করা। অযথা তর্কে জড়িয়ে বা রাগের বশবর্তী হয়ে নিজের সময় ও ইমান নষ্ট করবেন না। আমাদের মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী ইন্টারনেটের চেয়ে আমাদের পরিবার এবং আমাদের আখিরাত অনেক বেশি মূল্যবান।
আসুন, আমরা আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করি আমরা আর কোনো সস্তা টোপে পা দেব না। আমরা নিজেদের স্মার্টফোনের দাসে পরিণত হতে দেব না। বরং সচেতনতা এবং ধৈর্যের মাধ্যমে আমরা একটি সুন্দর ও ইতিবাচক ডিজিটাল জগত গড়ে তুলব। আল্লাহ আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের এই সমস্ত ফেতনা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
